তালের কোণ পিঠা রেসিপি । Traditional Taler Pitha Recipe - Shokher Rannaghor

Shokher Rannaghor - শখের রান্নাঘর

তালের কোণ পিঠা রেসিপি । Traditional Taler Pitha Recipe

তালের কোণ পিঠা রেসিপি | কাঁঠাল পাতায় তালের কোণ পিঠা তৈরির সহজ উপায়

বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি খাবারের নাম উঠলেই পিঠার কথা আসে। তার মধ্যে তালের পিঠা বিশেষ জনপ্রিয়—

বিশেষ করে বর্ষাকাল বা তালের মৌসুমে। আজ আমরা জানবো এক অনন্য রেসিপি: কাঁঠাল পাতায় তালের কোণ পিঠা
এই পিঠা গ্রামবাংলার ঘ্রাণে ভরপুর এবং কাঁঠাল পাতার সুবাসে আরও সুস্বাদু হয়ে ওঠে। চলুন জেনে নিই কীভাবে ঘরে বসেই তৈরি করবেন ঐতিহ্যবাহী এই সুস্বাদু তালের কোণ পিঠা।


তালের কোণ পিঠা কী?

তালের কোণ পিঠা মূলত তালের রস ও নারকেলের মিশ্রণে তৈরি এক প্রকার ভাঁপা পিঠা, যা কাঁঠাল পাতার ওপর মোড়ানো অবস্থায় চুলায় বা পাত্রে রান্না করা হয়। এতে থাকে তালের মিষ্টি ঘ্রাণ, নারকেলের কুচি ও চালের গুঁড়ার নরম স্বাদ— যা একসাথে মুখে দিলে মনে হবে যেন শৈশবের গ্রামের স্বাদ ফিরে এসেছে।

এই পিঠা তৈরিতে আলাদা করে চুলা বা ওভেনের প্রয়োজন নেই, সাধারণ হাঁড়ি বা স্টিমারেই সহজে তৈরি করা যায়।


উপকরণ (Ingredients)

তালের কোণ পিঠা তৈরি করতে যা যা লাগবে—

প্রধান উপকরণ:

  • পাকা তাল: ২টি
  • চালের গুঁড়া: ২ কাপ
  • নারকেল কুচি: ১ কাপ
  • গুড় (খেজুর গুড় বা চিনি): ১ কাপ (স্বাদমতো)
  • লবণ: এক চিমটি
  • কাঁঠাল পাতা: ৬-৮টি
  • পানি: পরিমাণমতো

ঐচ্ছিক উপকরণ (স্বাদ বাড়াতে):

  • দারুচিনি গুঁড়া: অল্প
  • এলাচ গুঁড়া: অল্প
  • ঘি: ১ চা চামচ


প্রস্তুত প্রণালী (Step-by-Step Recipe)

ধাপ ১: তালের রস তৈরি

১. পাকা তাল ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
২. খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের শাঁস হাত দিয়ে চেপে বা ছাঁকনি দিয়ে রস বের করে নিন।
৩. রসটি ছেঁকে নিন যাতে আঁশ না থাকে।

এই তালের রসই পিঠার মূল উপাদান — এর সুবাস ও মিষ্টতা পুরো পিঠায় ছড়িয়ে থাকে।


ধাপ ২: পিঠার মিশ্রণ তৈরি

১. একটি বড় পাত্রে চালের গুঁড়া নিন।
২. এর সাথে নারকেল কুচি, গুড় (বা চিনি), এবং এক চিমটি লবণ দিন।
৩. এরপর আস্তে আস্তে তালের রস মিশিয়ে খামিরের মতো একটি ঘন ব্যাটার তৈরি করুন।
৪. চাইলে সামান্য দারুচিনি বা এলাচ গুঁড়া মিশিয়ে দিতে পারেন।

টিপস: মিশ্রণটি যেন খুব পাতলা না হয়, আবার খুব ঘনও না হয় — মাঝারি ঘনত্বই সবচেয়ে উপযুক্ত।


ধাপ ৩: কাঁঠাল পাতা প্রস্তুত করা

১. কাঁঠাল পাতাগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে নিন।
২. সামান্য গরম পানিতে ২-৩ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে পাতা নরম হয়ে যায় এবং সহজে ভাঁজ করা যায়।
৩. এখন পাতা দিয়ে ছোট কোণের মতো আকার বানিয়ে নিন (যেমন ছোট চায়ের কাপের মতো)।
৪. পাতা একত্রে রাখতে বাঁশের কাঁটা বা সুতো ব্যবহার করতে পারেন।


ধাপ ৪: পিঠা ভাপানো

১. প্রস্তুত কাঁঠাল পাতার কোণের মধ্যে ২-৩ চামচ মিশ্রণ ঢালুন।
২. স্টিমার বা হাঁড়িতে পানি গরম করুন।
৩. স্টিমারে বা চুলার উপরে পাতাগুলো সাজিয়ে ১৫–২০ মিনিট ভাপিয়ে নিন।
৪. সময় শেষ হলে পিঠাগুলো বের করে কিছুক্ষণ ঠান্ডা হতে দিন।

যখন কাঁঠাল পাতা সামান্য শুকিয়ে বাদামী হয়ে আসবে, বুঝবেন পিঠা তৈরি হয়ে গেছে।


ধাপ ৫: পরিবেশন

তালের কোণ পিঠা গরম বা ঠান্ডা— দুইভাবেই খেতে দারুণ লাগে। চাইলে উপরে সামান্য ঘি বা দুধ ঢেলে পরিবেশন করতে পারেন। সকালে নাস্তা হিসেবে, বিকেলের চা-সময় বা অতিথি আপ্যায়নে এটি হবে এক অনন্য ট্রিট!


বিশেষ টিপস (Tips & Tricks)

  • তালের রস বেশি পাতলা হলে আগে একটু জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিন।
  • গুড়ের পরিবর্তে খেজুর গুড় ব্যবহার করলে পিঠার ঘ্রাণ আরও মনোমুগ্ধকর হবে।
  • কাঁঠাল পাতা না থাকলে কলাপাতা ব্যবহার করা যায়, তবে কাঁঠাল পাতার বিশেষ সুবাসই আসল স্বাদ এনে দেয়।
  • চালের গুঁড়া যদি ঘরে বানানো হয়, তবে পিঠা আরও নরম ও মোলায়েম হবে।
  • ভাপানোর সময় ঢাকনা ভালোভাবে বন্ধ করে রাখুন, যাতে বাষ্প ঠিকমতো থাকে।


পুষ্টিগুণ (Nutritional Value)

তালের পিঠা শুধু সুস্বাদুই নয়, পুষ্টিকরও বটে।

  • তাল ভিটামিন A, B ও পটাসিয়াম সমৃদ্ধ যা ত্বক ও হজমে সাহায্য করে।
  • নারকেল শরীরে ভালো ফ্যাট যোগায় এবং শক্তি বৃদ্ধি করে।
  • গুড় আয়রন ও খনিজে ভরপুর যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়ক।

অতএব, এই পিঠা শুধু ঐতিহ্যের স্বাদ নয়, স্বাস্থ্যসম্মত একটি স্ন্যাকস হিসেবেও উপযোগী।


তালের কোণ পিঠা আমাদের ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে যখন আমরা ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকছি, তখন এই ধরণের ঐতিহ্যবাহী রেসিপি আমাদের শিকড়ের সাথে পুনরায় সংযোগ ঘটায়। তালের মিষ্টি ঘ্রাণ, কাঁঠাল পাতার সুগন্ধ আর নারকেলের কোমলতা— সব মিলিয়ে এটি এক অসাধারণ স্বাদের পিঠা।

বর্ষার বিকেলে, এক কাপ চা আর পাশে গরম গরম তালের কোণ পিঠা— মনে হবে, যেন শৈশবের গ্রামীণ রান্নাঘর আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।


১. তালের কোণ পিঠা বানাতে কোন তাল ব্যবহার করা ভালো?

উত্তর: পাকা ও মিষ্টি তাল ব্যবহার করা সবচেয়ে ভালো। তাল যত পাকা হবে, পিঠার রং ও ঘ্রাণ তত সুন্দর হবে। কাঁচা তাল ব্যবহার করলে স্বাদে কষভাব আসতে পারে।


২. গুড় না দিয়ে কি তালের পিঠা তৈরি করা যায়?

উত্তর: হ্যাঁ, গুড়ের পরিবর্তে চিনি ব্যবহার করা যায়। তবে খেজুর গুড় দিলে পিঠার স্বাদ ও ঘ্রাণ অনেক বেশি উন্নত হয়। চিনি ব্যবহারে স্বাদ একটু হালকা লাগে।


৩. কাঁঠাল পাতা না থাকলে কী ব্যবহার করা যায়?

উত্তর: কাঁঠাল পাতা না থাকলে বিকল্প হিসেবে কলাপাতা ব্যবহার করা যায়। তবে কাঁঠাল পাতার নিজস্ব সুবাস পিঠার স্বাদকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।


৪. ওভেন ছাড়া কি তালের কোণ পিঠা বানানো সম্ভব?

উত্তর: অবশ্যই সম্ভব। সাধারণ হাঁড়ি বা স্টিমারে খুব সহজেই তালের কোণ পিঠা তৈরি করা যায়। শুধু ভাপানোর সময় ঢাকনা ভালোভাবে বন্ধ রাখতে হবে যাতে বাষ্প বের হয়ে না যায়।


৫. তালের রস যদি পাতলা হয়, তাহলে কী করা উচিত?

উত্তর: রস যদি বেশি পাতলা হয়, তবে একটু চুলায় জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিতে পারেন। ঘন রস ব্যবহার করলে পিঠা ভাপার সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।


৬. চালের গুঁড়া না থাকলে বিকল্প কী হতে পারে?

উত্তর: চালের গুঁড়ার বিকল্প হিসেবে সুজি বা গমের আটা ব্যবহার করা যায়। তবে চালের গুঁড়ায় পিঠা সবচেয়ে নরম ও ঐতিহ্যবাহী স্বাদে হয়।


৭. পিঠা কতক্ষণ ভাপাতে হয়?

উত্তর: সাধারণত ১৫–২০ মিনিট ভাপালেই পিঠা ভালোভাবে তৈরি হয়ে যায়। পাতার রং হালকা বাদামী হয়ে এলে বুঝবেন পিঠা রেডি।


৮. তালের কোণ পিঠা কতদিন সংরক্ষণ করা যায়?

উত্তর: ঘরের তাপমাত্রায় একদিন পর্যন্ত রাখা যায়। ফ্রিজে রাখলে ২–৩ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। খাওয়ার আগে হালকা গরম করে নিলে আগের মতো নরম হয়ে যাবে।


৯. তালের পিঠা কখন খেলে ভালো লাগে?

উত্তর: বর্ষাকাল বা তালের মৌসুমে বিকেলের নাশতায় এক কাপ চায়ের সঙ্গে খেলে এর স্বাদ সবচেয়ে ভালো লাগে। এছাড়া অতিথি আপ্যায়নেও এটি দারুণ জনপ্রিয় একটি আইটেম।


১০. তালের কোণ পিঠায় দুধ দেওয়া যায় কি?

উত্তর: হ্যাঁ, চাইলে ব্যাটারে সামান্য দুধ মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে পিঠা আরও নরম ও মোলায়েম হয়, তবে অতিরিক্ত দুধ দিলে মিশ্রণ পাতলা হয়ে যেতে পারে।


১১. এই পিঠা কি ভাজা যায়?

উত্তর: এটি সাধারণত ভাপা পিঠা, তবে চাইলে সামান্য তেলে হালকা ভেজেও খাওয়া যায়। ভাজা অবস্থায় এটি আরও ক্রিস্পি ও আলাদা স্বাদের হয়।


১২. তালের কোণ পিঠা কি ডায়াবেটিকদের জন্য উপযুক্ত?

উত্তর: এই পিঠায় গুড় বা চিনি ব্যবহৃত হয় বলে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য উপযুক্ত নয়। তবে চিনিমুক্ত গুড় বা সুগার-ফ্রি বিকল্প ব্যবহার করলে সামান্য পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।



Synergee থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.